
কর্ণফুলী টানেলের লোকসান নিয়ে কথা উঠলেই সামনে আসে বড় বড় অঙ্ক। ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার নির্মাণ ব্যয়। মাসে সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি ঘাটতি।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এত দিনে প্রায় কেউই করেনি। নিজের দৈনন্দিন খরচ নিজে চালাতে টানেলটির আসলে কতগুলো গাড়ি দরকার?
হিসাব কষে যে উত্তর মিলছে, তা চমকে দেওয়ার মতো ছোট। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যত গাড়ির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম গাড়ি চললে টানেলের পরিচালন ঘাটতি মুছে যেতে পারে।
অর্থাৎ টানেলটির দরকার স্বপ্নের সংখ্যা নয়। দরকার কয়েকটি হারিয়ে যাওয়া সংযোগ।
অঙ্কটা যেভাবে দাঁড়ায়
চলতি বছরের জুনে সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, টানেলে মাসে গড়ে টোল আয় ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, আর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। দিনের হিসাবে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
এবার দেখা যাক, একটি গাড়ি গড়ে কত টোল দেয়। টানেল কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, চালুর প্রথম বছরে ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪১২টি গাড়ি পার হয়েছে, টোল উঠেছে ৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। ভাগ করলে প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে এসেছে প্রায় ২৬৫ টাকা।
এই গড় টোল ধরে দৈনিক খরচ মেটাতে দরকার মোটামুটি ৮ হাজার ৭০০ গাড়ি।
এখন চলছে কত? আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী দিনে চার থেকে সাড়ে চার হাজার। আরেক হিসাবে ২০২৬ সালের শুরুর মাসগুলোতে এই সংখ্যা ৩ হাজার ৪২২ থেকে ৩ হাজার ৪৮৮টিতে নেমেছিল।
তাহলে ফারাকটা দাঁড়াচ্ছে দিনে মোটামুটি সোয়া চার থেকে সোয়া পাঁচ হাজার গাড়ি।
অথচ সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে দিনে গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলবে। পরিচালন খরচ ওঠাতে দরকার তার মাত্র ৩১ শতাংশ।
এক দিনেই তিন-চতুর্থাংশ
লক্ষ্যটা যে নাগালের বাইরে নয়, তার প্রমাণ টানেল নিজেই দিয়েছে। ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর ৬ হাজার ২০৮টি গাড়ি টানেল পার হয়, টোল ওঠে ১৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। সেদিন একাই দৈনিক খরচের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ উঠে এসেছিল।
এখনকার গড় চলাচলে প্রতিটি গাড়ি পারাপারে টানেল চালু রাখার খরচ পড়ছে পাঁচ শ টাকার বেশি। গাড়ি দিচ্ছে আড়াই শ টাকার কিছু বেশি। বাকিটা মেটাতে হচ্ছে জনগণের অর্থে।
এখানে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনও চোখে পড়ে। মন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, চালুর সময় দৈনিক পরিচালন খরচ ছিল প্রায় ৩৭ লাখ টাকা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ছেঁটে তা এখন ২২ থেকে ২৩ লাখে নামানো হয়েছে।
এর অর্থ বড়। আগের খরচে ঘাটতি মেটাতে দরকার হতো দিনে প্রায় ১৪ হাজার গাড়ি। খরচ কমায় লক্ষ্যটা নেমে এসেছে পৌনে ৯ হাজারে। অর্থাৎ পথের অর্ধেকটা খরচ কমিয়েই পার হওয়া গেছে।
ট্রাক এলে বদলে যায় হিসাব
বাকি পথ পাড়ি দেওয়ার চাবি সম্ভবত পণ্যবাহী ট্রাকের হাতে।
টানেলের টোলহারে প্রাইভেট কার দেয় ২০০ টাকা, অথচ ৮ থেকে ১১ টনের ট্রাক দেয় ৬০০ টাকা আর ৪ এক্সেলের ট্রেলার দেয় ১ হাজার টাকা। একটি মাঝারি ট্রাক তিনটি প্রাইভেট কারের সমান টোল দেয়।
সমস্যা হলো, ট্রাকই এই পথে আসছে না। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে টানেল ব্যবহার করছে মূলত ছোট ও হালকা যান, ভারী পণ্যবাহী গাড়ি পথটি এড়িয়ে চলছে।
দিনে ঘাটতি এখন মোটামুটি ১২ লাখ টাকা। হিসাব বলছে, প্রতিদিন দুই হাজারের মতো মাঝারি ট্রাক টানেলমুখী হলে এই ঘাটতির প্রায় পুরোটাই পূরণ হয়ে যায়।
ট্রাক কেন আসে না, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), চট্টগ্রাম দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা। তিনি জানান, বর্তমানে টানেল দিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেওয়া গাড়িগুলোকে আনোয়ারা থেকে উল্টো দিকে পটিয়া ক্রসিংয়ে এসে মহাসড়কে উঠতে হয় অথবা পেকুয়া হয়ে যেতে হয়। মূলত এই ঘোরাঘুরির কারণেই যানবাহনগুলো এদিকে আসতে চায় না।
হারিয়ে যাওয়া ১৭ কিলোমিটার
সমাধানের প্রথম ধাপ এরই মধ্যে কাগজে এসেছে। আনোয়ারার কালাবিবির দীঘির মোড় থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার সড়ক ৩৩৬ কোটি টাকায় প্রশস্ত করার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, এই অবস্থায় আনোয়ারা থেকে সরাসরি এই সড়কটি চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাথে যুক্ত হবে। এতে কক্সবাজারে যেতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় কমে যাবে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা-কালাবিবির দীঘি থেকে বরকল ব্রিজ পর্যন্ত অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। আর চন্দনাইশের বরকল ব্রিজ থেকে গাছবাড়িয়া কলেজ গেইট পর্যন্ত অংশে ১৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যে দুই অংশের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার পর কাজ শুরু হবে। তিনি আশাবাদী, এই সড়কটির কাজ শেষ হলে টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল অনেক বাড়বে।
সড়কটি ১৮ ফুট থেকে ৩৪ ফুট চওড়া হবে। তবে সময়টাও হিসাবের অংশ। ঠিকাদার কাজ শুরুর পর শেষ হতে লাগবে দুই বছর। এই সময়ে প্রতি মাসে সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি ঘাটতি জমতে থাকবে। কাজ যত দ্রুত শুরু হয়, লোকসানের খাতা তত আগে বন্ধ হওয়ার সুযোগ।
আনোয়ারার কারখানা, আগামী দিনের গাড়ি
টানেলের দক্ষিণ পাড়ে আরেকটি পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। চলতি বছরের ২৭ জুলাই আনোয়ারার বেলচূড়ায় বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠছে এই শিল্পাঞ্চল।
চীনা রাষ্ট্রদূতের বরাতে জানা গেছে, ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি আনোয়ারায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
কারখানা মানে কাঁচামালের ট্রাক, শ্রমিকের বাস, পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান। বন্দর থেকে আনোয়ারার দূরত্ব টানেল দিয়েই সবচেয়ে কম। শিল্পাঞ্চল চালু হলে টানেলের সবচেয়ে বড় গ্রাহক হতে পারে এই এলাকাই।
আইএমইডিও একই দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে। আনোয়ারায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বন্দরের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহন টানেলমুখী করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী ৭৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
টোলের বাইরেও আয়ের পথ আছে। ৪৮৪ কোটি টাকায় নির্মিত সেবা এলাকাটি তৃতীয় পক্ষকে ইজারা দেওয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। স্থাপনাটি কাজে লাগলে তা ঘাটতি কমানোর আরেকটি উৎস হতে পারে।
ছোট যানের প্রশ্নও আলোচনায় আছে। চালুর সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল টানেলে মোটরসাইকেল বা দুই চাকার কোনো যান চলবে না। গত বছর জানা যায়, যান চলাচল বাড়াতে থ্রি-হুইলার ও মোটরসাইকেলকে অনুমতি দেওয়ার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এমন সিদ্ধান্ত নিলে দুই পাড়ের সাধারণ মানুষের যাতায়াতও সহজ হবে।
যে হিসাব এখনো বাকি
একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। এই অঙ্ক শুধু টানেল চালু রাখার খরচের। নির্মাণের ঋণ এর বাইরে। টানেলের ব্যয়ের মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা এসেছে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ থেকে। সেই ঋণ শোধের চাপ আলাদা।
জবাবদিহির প্রশ্নও রয়ে গেছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের ৬৮টি নিরীক্ষা আপত্তি অনিষ্পন্ন থাকার কথা বলা হয়েছে, যার ৪৮টি গুরুতর। এগুলোর নিষ্পত্তি টানেলের প্রতি আস্থা ফেরাতেও ভূমিকা রাখবে।
তবু হিসাবটা আশা জাগায়। যে টানেলকে অনেকে বোঝা বলে ধরে নিয়েছেন, তার পরিচালন ঘাটতি মেটাতে দরকার দিনে আর কয়েক হাজার গাড়ি। খরচ কমানোর কাজ অর্ধেক পথ পেরিয়েছে।
বাকি পথের ঠিকানা লেখা আছে নদীর ওপরে। আনোয়ারা থেকে গাছবাড়িয়া পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার সড়কে, আর বেলচূড়ার মাঠে উঠতে যাওয়া কারখানার দেয়ালে। সেগুলো যত দ্রুত দাঁড়াবে, নদীর নিচের পথটি তত দ্রুত লোকসানের গল্প থেকে বেরিয়ে আসবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), চট্টগ্রাম দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, বর্তমান ঘোরানো পথের কারণে কক্সবাজারগামী যানবাহনগুলো টানেল এড়িয়ে চলে। আনোয়ারা থেকে পটিয়া ক্রসিং বা পেকুয়া হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ পথই মূলত এর জন্য দায়ী।
এই সমস্যার সমাধানে আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ পর্যন্ত সরাসরি মহাসড়ক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিন্টু চাকমা আশাবাদী যে, এর ফলে কক্সবাজারের যাতায়াতে ৩০ মিনিট সময় কমে যাবে এবং টানেলে যান চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
প্রকল্পটির আওতায় আনোয়ারা-কালাবিবির দীঘি থেকে বরকল ব্রিজ অংশে ১৮২ কোটি টাকা এবং বরকল ব্রিজ থেকে গাছবাড়িয়া কলেজ গেট অংশে ১৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পিন্টু চাকমা আরও নিশ্চিত করেছেন যে, উভয় অংশের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং ওয়ার্ক অর্ডার পেলেই চূড়ান্ত কাজ শুরু হবে।