October 28, 2026, 10:44 pm
শিরোনাম :
ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান, শতাধিক অবৈধ অবকাঠামো উচ্ছেদসহ মালামাল জব্দ সব সম্পদের বিনিময়ে মুক্তি চান মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযুক্ত শিক্ষক সাগর এনসিপির জেলা থেকে ওয়ার্ড কমিটিতে থাকতে পারবেন না চলমান শিক্ষার্থীরা কাবা শরীফে পৃথক জামাতের প্রচলন বন্ধ করে এক ইমামের পেছনে নামাজের ১০০ বছর মিরপুরে আলোকস্বল্পতায় বন্ধ খেলা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমাতে চায় সরকার : প্রতিমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হটাতে আরব ইসরায়েলিদের সঙ্গে জোট করার আহ্বান বিরোধী নেতার চট্টগ্রামে দুই হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের ৭ দিনের রিমান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোক স্টুডিওর বিশেষ প্রতিযোগিতা সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইউএনও প্রত্যাহারসহ চার দাবি ১১ দলীয় জোটের

সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনেছিলেন দুজনে মিলে। খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। এরপর বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনাও ছিল চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়ের।

 

সেই সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না আঁচলের। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। স্বামী বিপ্লবও পাশে থেকে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।

 

বিয়ের ছবি-ভিডিও, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে। সেসব ছবির মানুষটি আর নেই। আছে খিলগাঁওয়ের সেই বাসা, কেনা কিছু জিনিস আর দুজনে মিলে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

বিয়ের পরও আলাদা শহরে

 

গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ঘটা করে বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। এর তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। চাকরি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেরই ব্যস্ততা ছিল।

 

বিয়ের পর নিয়মিত এক ছাদের নিচে থাকা হয়নি তাঁদের। চাকরির কারণে আঁচল ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, বিপ্লব জামালপুরে। পরে একজন ঢাকায়, আর অন্যজন বরগুনায়।

 

ছুটি পেলে কিংবা ঢাকায় কাজ থাকলে দেখা হতো। সেই অল্প সময়েই চলত সংসারের হিসাব। কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন, কবে দুজন একসঙ্গে থাকবেন—এসব নিয়েই ছিল তাঁদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা–বাবার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও কিনেছিলেন। ধীরে ধীরে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল ঘরটি।

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেছিলেন দুজন। বরিশালে, বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করবেন। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তাঁরা।

 

২৮ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে কথা হয় আঁচলের স্বামী বিপ্লবের সঙ্গে। তিনি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

 

বিপ্লব প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু তাঁদের সংসারটাও গোছানোর সময় দিল না।

 

২১ সেপ্টেম্বরের সেই জ্বর

 

আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। জ্বর নিয়েই সেদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন। পরে ল্যাব থেকে লোক এনে পরীক্ষা করানো হয়। তখন তাঁর প্লাটিলেট ছিল এক লাখ। মুখে খাবারও খেতে পারছিলেন।

 

তবু বিপ্লব তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিলেন। কিন্তু আঁচল রাজি হননি। বলেছিলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালে যাবেন।

 

এরপর দ্রুত কমতে থাকে প্লাটিলেট। ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আঁচলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন একটি কাজে বিপ্লব ছিলেন বরিশালে।

 

হাসপাতালে ভর্তির পর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। এইচডিইউ, আইসিইউ—একপর্যায়ে তাঁকে একের পর এক জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

ফলো করুন

বিয়ের এই ছবি-ভিডিওসহ স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে

বিয়ের এই ছবি-ভিডিওসহ স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়েছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনেছিলেন দুজনে মিলে। খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। এরপর বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনাও ছিল চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়ের।

 

সেই সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না আঁচলের। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। স্বামী বিপ্লবও পাশে থেকে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।

 

বিয়ের ছবি-ভিডিও, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে। সেসব ছবির মানুষটি আর নেই। আছে খিলগাঁওয়ের সেই বাসা, কেনা কিছু জিনিস আর দুজনে মিলে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

 

খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন বিপ্লব ও আঁচল। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল তাঁদের

খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন বিপ্লব ও আঁচল। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল তাঁদেরছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

বিয়ের পরও আলাদা শহরে

 

গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ঘটা করে বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। এর তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। চাকরি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেরই ব্যস্ততা ছিল।

 

বিয়ের পর নিয়মিত এক ছাদের নিচে থাকা হয়নি তাঁদের। চাকরির কারণে আঁচল ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, বিপ্লব জামালপুরে। পরে একজন ঢাকায়, আর অন্যজন বরগুনায়।

 

ছুটি পেলে কিংবা ঢাকায় কাজ থাকলে দেখা হতো। সেই অল্প সময়েই চলত সংসারের হিসাব। কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন, কবে দুজন একসঙ্গে থাকবেন—এসব নিয়েই ছিল তাঁদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা–বাবার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও কিনেছিলেন। ধীরে ধীরে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল ঘরটি।

 

 

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেছিলেন দুজন। বরিশালে, বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করবেন। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তাঁরা।

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেছিলেন দুজন। বরিশালে, বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করবেন। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তাঁরা।

 

২৮ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে কথা হয় আঁচলের স্বামী বিপ্লবের সঙ্গে। তিনি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

 

বিপ্লব প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু তাঁদের সংসারটাও গোছানোর সময় দিল না।

 

২১ সেপ্টেম্বরের সেই জ্বর

 

আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। জ্বর নিয়েই সেদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন। পরে ল্যাব থেকে লোক এনে পরীক্ষা করানো হয়। তখন তাঁর প্লাটিলেট ছিল এক লাখ। মুখে খাবারও খেতে পারছিলেন।

 

তবু বিপ্লব তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিলেন। কিন্তু আঁচল রাজি হননি। বলেছিলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালে যাবেন।

 

এরপর দ্রুত কমতে থাকে প্লাটিলেট। ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আঁচলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন একটি কাজে বিপ্লব ছিলেন বরিশালে।

 

হাসপাতালে ভর্তির পর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। এইচডিইউ, আইসিইউ—একপর্যায়ে তাঁকে একের পর এক জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

 

 

এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর আঁচলের ফেসবুকে পিন করে রাখা

এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর আঁচলের ফেসবুকে পিন করে রাখাছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

বিপ্লব বলেন, ‘আঁচল প্রটোকলের বাইরে কোনো ওষুধ খেতে চাইত না। আর নিজেই ছিল খুব ব্রাইট চিকিৎসক। হাসপাতালে ভর্তি হলে ক্যানুলা করতে হবে, এটা নিয়েও ভয় পেত। আর সেই আঁচলকেই হাসপাতালের এইচডিইউ, আইসিইউ ঘুরে কয়েক দফায় কষ্টদায়ক কিছু প্রসিডিউরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’

 

চিকিৎসকদের পাশাপাশি আঁচলের চিকিৎসায় নিজেও যুক্ত ছিলেন বিপ্লব। স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন চিকিৎসক হিসেবে, আবার পাশে থেকেছেন স্বামী হিসেবেও।

 

বিপ্লব বলেন, ‘চিকিৎসকদের পাশাপাশি নিজের মনের সান্ত্বনার জন্য আঁচলকে নিজেও সিবিআই (জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি) দিই। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।’

 

‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে’

 

আইসিইউতে থাকা স্ত্রীকে তখনো সাহস দিচ্ছিলেন বিপ্লব। বলছিলেন, ‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।’

 

চিকিৎসক হিসেবে পরিস্থিতির কঠিন দিকগুলো তিনি জানতেন। কিন্তু স্বামী হিসেবে বিশ্বাস করতে চাইছিলেন, আঁচল তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন না।

 

বিপ্লব বলেন, ‘আমার বিশ্বাস ছিল, ও আমাকে ছেড়ে আগে চলে যাবে না। তবে চলেই গেল।’

 

চিকিৎসকদের পাশাপাশি নিজেও আঁচলের চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন বিপ্লব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা থেমে যায়। যেখান থেকে আর কেউ কোনো দিন ফিরতে পারেন না, ২৭ সেপ্টেম্বর আঁচল চলে গেছেন সেই ঠিকানায়।

পড়াশোনাই ছিল ধ্যানজ্ঞান

 

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে দুজনের পরিচয়। বিপ্লব ছিলেন পঞ্চম ব্যাচের, আঁচল সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানান। পরে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়।

 

বিপ্লব বলেন, আঁচল ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। পড়াশোনাকে ধ্যানজ্ঞান মনে করতেন। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর ফেসবুকে পিন করে রেখেছেন। গত বছরের নভেম্বরে বিভাগীয় পরীক্ষাতেও পাস করেন তিনি।

 

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করছিলেন আঁচল। শিগগিরই চাকরি স্থায়ীকরণের তালিকায় তাঁর নাম আসার কথা ছিল।

 

বিপ্লব বলেন, বিসিএস ও পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের ক্ষেত্রে আঁচল তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর গর্বের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

 

বিপ্লব বলেন, ‘আমি আঁচলকে নিয়ে সব সময় গর্ব করতাম। আমি নিজেও চিকিৎসক। তারপরও আমার কাছে কেউ পরামর্শের জন্য এলে বলতাম, আমার স্ত্রী খুব ভালো ডাক্তার। তাঁর কাছ থেকে জেনে নিই আমি যে ওষুধটা দিতে চাচ্ছি, তা ঠিক আছে কি না।’

 

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতনও ছিলেন দুজন। বাসায় মশারি টানাতেন, মশার কামড় থেকে বাঁচার চেষ্টা করতেন। কোথায় আঁচল আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা অবশ্য তাঁদের জানা নেই। হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে যেতে হয়েছে।

 

বিপ্লব আরও বলেন, সরকার ডেঙ্গুর জন্য দায়ী মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তো আর এই মশা থাকার কথা ছিল না। এত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতো না। তাঁর মতে, ডেঙ্গুর ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে।

ফলো করুন

বিয়ের এই ছবি-ভিডিওসহ স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে

বিয়ের এই ছবি-ভিডিওসহ স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়েছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনেছিলেন দুজনে মিলে। খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। এরপর বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনাও ছিল চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়ের।

 

সেই সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না আঁচলের। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। স্বামী বিপ্লবও পাশে থেকে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।

 

বিয়ের ছবি-ভিডিও, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে। সেসব ছবির মানুষটি আর নেই। আছে খিলগাঁওয়ের সেই বাসা, কেনা কিছু জিনিস আর দুজনে মিলে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

 

খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন বিপ্লব ও আঁচল। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল তাঁদের

খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন বিপ্লব ও আঁচল। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল তাঁদেরছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

বিয়ের পরও আলাদা শহরে

 

গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ঘটা করে বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। এর তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। চাকরি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেরই ব্যস্ততা ছিল।

 

বিয়ের পর নিয়মিত এক ছাদের নিচে থাকা হয়নি তাঁদের। চাকরির কারণে আঁচল ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, বিপ্লব জামালপুরে। পরে একজন ঢাকায়, আর অন্যজন বরগুনায়।

 

ছুটি পেলে কিংবা ঢাকায় কাজ থাকলে দেখা হতো। সেই অল্প সময়েই চলত সংসারের হিসাব। কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন, কবে দুজন একসঙ্গে থাকবেন—এসব নিয়েই ছিল তাঁদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

 

খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা–বাবার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও কিনেছিলেন। ধীরে ধীরে গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল ঘরটি।

 

 

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেছিলেন দুজন। বরিশালে, বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করবেন। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তাঁরা।

৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নতুন পরিকল্পনা করেছিলেন দুজন। বরিশালে, বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করবেন। সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তাঁরা।

 

২৮ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে কথা হয় আঁচলের স্বামী বিপ্লবের সঙ্গে। তিনি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

 

বিপ্লব প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু তাঁদের সংসারটাও গোছানোর সময় দিল না।

 

২১ সেপ্টেম্বরের সেই জ্বর

 

আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। জ্বর নিয়েই সেদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন। পরে ল্যাব থেকে লোক এনে পরীক্ষা করানো হয়। তখন তাঁর প্লাটিলেট ছিল এক লাখ। মুখে খাবারও খেতে পারছিলেন।

 

তবু বিপ্লব তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিলেন। কিন্তু আঁচল রাজি হননি। বলেছিলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালে যাবেন।

 

এরপর দ্রুত কমতে থাকে প্লাটিলেট। ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আঁচলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন একটি কাজে বিপ্লব ছিলেন বরিশালে।

 

হাসপাতালে ভর্তির পর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। এইচডিইউ, আইসিইউ—একপর্যায়ে তাঁকে একের পর এক জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

 

 

এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর আঁচলের ফেসবুকে পিন করে রাখা

এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর আঁচলের ফেসবুকে পিন করে রাখাছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

বিপ্লব বলেন, ‘আঁচল প্রটোকলের বাইরে কোনো ওষুধ খেতে চাইত না। আর নিজেই ছিল খুব ব্রাইট চিকিৎসক। হাসপাতালে ভর্তি হলে ক্যানুলা করতে হবে, এটা নিয়েও ভয় পেত। আর সেই আঁচলকেই হাসপাতালের এইচডিইউ, আইসিইউ ঘুরে কয়েক দফায় কষ্টদায়ক কিছু প্রসিডিউরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’

 

চিকিৎসকদের পাশাপাশি আঁচলের চিকিৎসায় নিজেও যুক্ত ছিলেন বিপ্লব। স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন চিকিৎসক হিসেবে, আবার পাশে থেকেছেন স্বামী হিসেবেও।

 

বিপ্লব বলেন, ‘চিকিৎসকদের পাশাপাশি নিজের মনের সান্ত্বনার জন্য আঁচলকে নিজেও সিবিআই (জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি) দিই। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।’

 

‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে’

 

আইসিইউতে থাকা স্ত্রীকে তখনো সাহস দিচ্ছিলেন বিপ্লব। বলছিলেন, ‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।’

 

চিকিৎসক হিসেবে পরিস্থিতির কঠিন দিকগুলো তিনি জানতেন। কিন্তু স্বামী হিসেবে বিশ্বাস করতে চাইছিলেন, আঁচল তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন না।

 

বিপ্লব বলেন, ‘আমার বিশ্বাস ছিল, ও আমাকে ছেড়ে আগে চলে যাবে না। তবে চলেই গেল।’

 

চিকিৎসকদের পাশাপাশি নিজেও আঁচলের চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন বিপ্লব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা থেমে যায়। যেখান থেকে আর কেউ কোনো দিন ফিরতে পারেন না, ২৭ সেপ্টেম্বর আঁচল চলে গেছেন সেই ঠিকানায়।

 

আগে মাঝেমধ্যে আঁচল মজা করে বলত, সে আমার আগে মারা গেলে তাঁর সমাধিতে যেন সাদা ফুল নিয়ে যাই। ওর কথামতো আমি সাদা গোলাপ নিয়ে গেলাম…।

বিপ্লব চন্দ্র দাস, চিকিৎসক ও আঁচলের স্বামী

পড়াশোনাই ছিল ধ্যানজ্ঞান

 

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে দুজনের পরিচয়। বিপ্লব ছিলেন পঞ্চম ব্যাচের, আঁচল সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানান। পরে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়।

 

বিপ্লব বলেন, আঁচল ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। পড়াশোনাকে ধ্যানজ্ঞান মনে করতেন। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করার খবর ফেসবুকে পিন করে রেখেছেন। গত বছরের নভেম্বরে বিভাগীয় পরীক্ষাতেও পাস করেন তিনি।

 

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করছিলেন আঁচল। শিগগিরই চাকরি স্থায়ীকরণের তালিকায় তাঁর নাম আসার কথা ছিল।

 

বিপ্লব বলেন, বিসিএস ও পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের ক্ষেত্রে আঁচল তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর গর্বের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

 

বিপ্লব বলেন, ‘আমি আঁচলকে নিয়ে সব সময় গর্ব করতাম। আমি নিজেও চিকিৎসক। তারপরও আমার কাছে কেউ পরামর্শের জন্য এলে বলতাম, আমার স্ত্রী খুব ভালো ডাক্তার। তাঁর কাছ থেকে জেনে নিই আমি যে ওষুধটা দিতে চাচ্ছি, তা ঠিক আছে কি না।’

 

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতনও ছিলেন দুজন। বাসায় মশারি টানাতেন, মশার কামড় থেকে বাঁচার চেষ্টা করতেন। কোথায় আঁচল আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা অবশ্য তাঁদের জানা নেই। হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে যেতে হয়েছে।

 

বিপ্লব আরও বলেন, সরকার ডেঙ্গুর জন্য দায়ী মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তো আর এই মশা থাকার কথা ছিল না। এত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতো না। তাঁর মতে, ডেঙ্গুর ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে।

 

আঁচল ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। ছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

 

আঁচল ছিলেন মেধাবী চিকিৎসক। ছবি: আঁচলের ফেসবুক থেকে নেওয়া

যে ছবিটি আঁচল দেখে যেতে পারলেন না

 

আঁচলের মৃত্যুর পর ২৮ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে তাঁদের দুজনের একটি ছবি পোস্ট করেছেন বিপ্লব। ছবিতে বিপ্লবের পরনে পাঞ্জাবিটি আঁচলের দেওয়া। আর আঁচলের শাড়িটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের ছোট বোন।

 

বিপ্লব বলেন, ছবিটি অনেক আগেই ফেসবুকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যস্ততায় দেওয়া হয়নি। এ কারণে আঁচল অভিমান করেছিলেন। আঁচল বেঁচে থাকতে আর ছবিটি পোস্ট করা হয়নি।

 

ওই পোস্টে বিপ্লব লিখেছেন, ‘ছবিটা আপলোড দিতে এতটা দেরি হবে বুঝতে পারি নাই।’

 

‘আমরা দুজনে আবার এক হতে চাই’

 

স্ত্রীকে হারানোর পর ফেসবুকে আরেকটি পোস্টে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা লিখেছেন বিপ্লব।

 

সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর দেশে জন্মাইনি যেহেতু, তিনি একটা অথবা আরেকটি মৃত্যুর উপহার দিতেই পারেন আমাকে। আমরা দুজনে আবার এক হতে চাই, বৈকুণ্ঠধামে। কারণ, ও বা আমি পরস্পরের সঙ্গে কথা না হলে কেউই ভালো থাকব না। স্বর্গে হোক কিংবা মর্তে।’

 

যে দুজন মানুষ একসঙ্গে একটি সংসার সাজানোর পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁদের একজন এখন স্মৃতি। অন্যজনের সামনে পড়ে আছে সেই অসমাপ্ত সংসার, কেনা জিনিসপত্র আর দুজনের মিলে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।