October 29, 2026, 2:32 am
শিরোনাম :
ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান, শতাধিক অবৈধ অবকাঠামো উচ্ছেদসহ মালামাল জব্দ সব সম্পদের বিনিময়ে মুক্তি চান মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযুক্ত শিক্ষক সাগর এনসিপির জেলা থেকে ওয়ার্ড কমিটিতে থাকতে পারবেন না চলমান শিক্ষার্থীরা কাবা শরীফে পৃথক জামাতের প্রচলন বন্ধ করে এক ইমামের পেছনে নামাজের ১০০ বছর মিরপুরে আলোকস্বল্পতায় বন্ধ খেলা ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমাতে চায় সরকার : প্রতিমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হটাতে আরব ইসরায়েলিদের সঙ্গে জোট করার আহ্বান বিরোধী নেতার চট্টগ্রামে দুই হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের ৭ দিনের রিমান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোক স্টুডিওর বিশেষ প্রতিযোগিতা সেনাবাহিনী মোতায়েন ও ইউএনও প্রত্যাহারসহ চার দাবি ১১ দলীয় জোটের

মেরিন ড্রাইভে শত শত হোটেল-রিসোর্ট, নেই ফায়ার স্টেশন

অনলাইন ডেস্ক

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ৮০ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই এখানে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা। অথচ পর্যটনসমৃদ্ধ এই এলাকায় নেই ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্থায়ী স্টেশন। আগুন লাগলে ভরসা উখিয়া ও কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। দূরত্ব ও সড়কপথের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়, ততক্ষণে আগুনে পুড়ে যায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু ও ছয়জন আহত হওয়ার পর মেরিন ড্রাইভ এলাকার হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অনেক প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দাবি, দ্রুত ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

আগুন নেভানোর ব্যবস্থা নেই ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভে

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী পাথুরে সৈকত, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফ সৈকত। এসব এলাকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি জরুরি অগ্নিনির্বাপণসেবা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন এলাকায় আগুন লাগলে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে কোটবাজার হয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হয়। কোনো কোনো স্থানে দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুবিন বলেন, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকান্ডে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এত দেরিতে পৌঁছানোর কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহীম আহমেদ বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হলেও এখানে ফায়ার সার্ভিসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আগুন লাগলে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। সড়কপথে দূরত্ব বেশি হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে।

ইব্রাহীম আহমেদের ভাষ্য, এলাকায় আগেও বিভিন্ন বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় বাড়িঘর পুড়ে যায়। অথচ এখানে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গা রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলে স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তাও বাড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যটন এলাকায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানানো হচ্ছে। উখিয়া সদর থেকে কোটবাজার হয়ে মেরিন ড্রাইভে আসতে হয় বলে যানজটসহ নানা কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়। এতে অগ্নিকাণ্ডে জানমাল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শামশুল আলম বলেন, ইনানীতে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হলে উখিয়া, ইনানী ও টেকনাফের মধ্যবর্তী পর্যটন এলাকাগুলোতে দ্রুত জরুরি সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে।

লাইসেন্স ছিল না টুপটুপ রিসোর্টের

পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শনিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধতা নেয়নি বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, মেরিন ড্রাইভ এলাকার অনেক হোটেল-রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন।

পর্যটক সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। পাশাপাশি হোটেল কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হোটেল চালুর আগে এবং পরিচালনার সময় নিয়মিতভাবে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি।

তিনি বলেন, হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে হয়তো এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। তাই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরই হোটেল পরিচালনা করা উচিত।

পর্যটক মোবারক হোসেন বলেন, মেরিন ড্রাইভের হোটেলগুলোর আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন না থাকায় এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ। কোন হোটেলের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে আর কোনটির নেই, সে বিষয়েও পর্যটকদের আগে জানার সুযোগ ছিল না। নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা পেতে দেরি হতে পারে, যা প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ায়।

হোটেল-রিসোর্টের বৈধতা ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

ইউএনও বলেন, কিছুদিন আগেও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কয়েকজন সদস্য ও জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকটি হোটেল-রিসোর্টে অভিযান চালিয়েছেন। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত বৈধতা, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে।

মেরিন ড্রাইভে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা

মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পাশাপাশি স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, বর্তমানে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে হয়। মেরিন ড্রাইভে ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হলে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও দ্রুত ও সহজ হবে।

তিনি বলেন, সেখানে একটি স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়বে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

পর্যটননির্ভর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর হয়নি। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড সেই দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এখন দ্রুত ফায়ার স্টেশন স্থাপন, হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন যাচাই এবং নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির মাধ্যমে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।