
তালাবদ্ধ একটি ঘর। সেই ঘরের ভেতরেই একা পড়ে আছেন প্রায় ৫০ বছর বয়সী সাবেক সেনা সদস্য মামুনুর রশিদ। বাইরে থেকে ডাক দিলে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগিয়ে আসেন জানালার কাছে। এক হাত ও এক পা অচল। শরীরের বাকি শক্তিটুকু সম্বল করে কোনোমতে চলাফেরা করেন। পরনের জামাকাপড় নোংরা, শরীরে অসুস্থতার ছাপ। নিজের কাজটুকু করারও যেন সামর্থ্য নেই তার। একসময় যিনি দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন, আজ নিজের ঘরেই এমন এক বন্দিজীবন কাটছে তার।
যেখানে নেই আপনজনের সঙ্গ, নেই স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাড়িতে তালা দিয়ে চলে গেছেন স্ত্রী-সন্তানরা। সেই থেকে ঘরের ভেতর একাই দিন কাটছে তার। নেই মোবাইল ফোন, নেই কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ। প্রয়োজনের কথা কাউকে জানাবেন, সেই উপায়ও নেই।
ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর এতিমখানা মোড়ের ৮ নম্বর গলির ওই বাড়িতে থাকেন মামুনুর রশিদ। প্রায় ১০ বছর আগে স্ট্রোক করার পর থেকেই অসুস্থ তিনি। ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে এক হাত ও এক পা। এরপর থেকে অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলাফেরা করাই কঠিন হয়ে পড়ে তার। অথচ এই কঠিন সময়ে পাশে নেই পরিবারের কেউ। খাবারটুকু জোটে অন্যের দয়ায়। জানালা দিয়ে তার জন্য খাবার দিয়ে যান প্রতিবেশী। এভাবেই দিনের পর দিন ঘরের ভেতর পড়ে আছেন অসুস্থ মানুষটি। কথা বলতে গিয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন মামুনুর রশিদ।
জানা গেছে, মামুনুর রশিদের দুই স্ত্রী। তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মাকসুদা তাওমিনা নকশিকে নিয়ে এই বাড়িতে বাস করতেন। তাদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলে রাব্বিল হোসেন ইশান নির্বাচন অফিসে চাকরি করেন। বড় মেয়ে অনামিকা পুষ্প মেধা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
মামুনুর রশিদ বলেন, গত এক মাস ধরে আমি এই ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় আছি। আমার মোবাইল ফোন নেই, কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমার স্ত্রী আমাকে রেখে ঘরে তালা মেরে গেছেন। পাশের বাড়ির একজন জানালা দিয়ে খাবার দেন। এমতাবস্থায় আমি জানতে চাই, আমার স্ত্রী-সন্তান কী অবস্থায় আছে, কোথায় আছে, আদৌ তারা বেঁচে আছে কিনা। আমি চাই, আমার চিকিৎসা করা হোক। সেটা সরকারের পক্ষ থেকে হোক, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে হোক আর আমার ইউনিটির পক্ষ থেকে হোক।
প্রতিবেশী হাফিজা সুলতানা বলেন, গত মাসের ১৫ তারিখে তার স্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, আপনি তাকে একটু খাবার দিয়েন। ১৬ তারিখ থেকে দুপুরে ও রাতে খাবার দিচ্ছি এবং সকালে কলা-রুটি দিচ্ছি। এরপর থেকে তার স্ত্রী আর আমাকে ফোন দিয়ে বলেননি যে আপনি তাকে খাবার দিচ্ছেন কি না। অথবা আপনি যে খাবার দিচ্ছেন, এর জন্য আমি এসে আপনাকে টাকা দেব। তার স্ত্রী একবারের জন্যও বলেননি যে তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন। লোকটা সবসময় বলেন, তার চিকিৎসার দরকার। কিন্তু আমার পক্ষে তো তার চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।
কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মীর ফজলে এলাহী শিমুল বলেন, আমাদের মামুন ভাইকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অমানবিকভাবে তার স্ত্রী-সন্তান ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে বাইরে কোথাও চলে গেছেন। এটি একেবারেই অমানবিক কাজ। আমি আশা করি, তার পরিবারের সদস্যরা তার পাশে থাকবেন। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত যে সেনা সদস্যরা আছেন, তারাও যেন তার পাশে এসে দাঁড়ান। আর মানবিক কাজ যারা করেন, তারাও যেন তার পাশে এসে দাঁড়ান।
বিষয়টি নিয়ে তার স্ত্রীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সহানুভূতির বদলে কথা বলেন রূঢ় ভাষায়।
মামুনুর রশিদের স্ত্রী মাকসুদা তাওমিনা নকশি বলেন, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে ওর ভেতরেই বেঁচে থাকবে। আমার স্বামীকে আমি ঘরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখি আর যে অবস্থায় রাখি, তাতে আপনাদের কী? আমি বুঝলাম না, আপনাদের এত সমস্যা হচ্ছে কেন। তাকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী ও তার ভাই-ভাতিজারা তার খোঁজখবর নিচ্ছে।