ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ কয়েকবার এমন মুহূর্ত এসেছে, যখন একক কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে এবারের নির্বাচনের পর জেরুজালেমের নেসেটে (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট) যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দেশটির নির্বাচনি ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। রয়টার্স ও দ্য জেরুজালেম পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে ১২০ আসনের নেসেটে ডানপন্থি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট কিংবা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ও জাইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট; কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদু সংখ্যা ৬১ স্পর্শ করতে পারেনি।
এই গাণিতিক সমীকরণের মধ্যেই উঠে এসেছে সবচেয়ে বড় চমক। দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিতে বর্জিত ও প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি আরব রাজনৈতিক দলগুলো—বিশেষ করে মনসুর আব্বাসের রা’আম এবং হেদাশ-তা’আলের জয়েন্ট লিস্ট হঠাৎ করেই জেরুজালেমের মসনদের মূল চাবিকাঠি বা কিংমেকার হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপির রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে নেতানিয়াহুকে ৬১টি আসনের কোরাম পূর্ণ করতেই হবে। কিন্তু তার সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা, যার প্রতিটিই রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। প্রথমত, নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের প্রধান ভিত্তি হলো অতি-অর্থোডক্স ও উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলো। তারা যে কোনো আরব দলের সঙ্গে আপস করার ঘোর বিরোধী। দ্বিতীয়ত, সরকার বাঁচাতে যদি নেতানিয়াহু পরোক্ষভাবেও মনসুর আব্বাসের রা’আম পার্টির সমর্থন বা ভোটদানে বিরত থাকার সহায়তা নেন, তবে তার উগ্র ডানপন্থি সহযোগীরা মুহূর্তের মধ্যে জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, দুর্নীতি মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্ষমতা হারানো মাত্রই নেতানিয়াহুর কারাদণ্ডের ভয় রয়েছে। ফলে চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত আরব দলগুলোর রাজনৈতিক চালের ওপর এখন নেতানিয়াহুর টিকে থাকা ও পতন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। বছরের পর বছর ধরে মূলধারার ইসরায়েলি রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা কেবল বিরোধী দলের আসনেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি কেন্দ্রিক সাময়িকী ফরেন পলিসি এবং আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব দলগুলোর কৌশলগত পরিবর্তন তাদের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
রা’আম দলের নেতা মনসুর আব্বাস কোনো আদর্শিক বিতর্কে না গিয়ে কঠোর বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করেছেন। তার বার্তা পরিষ্কার, যে পক্ষ আরব লোকালয়ের নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন সমস্যা সমাধান এবং কোটি কোটি শেকেলের বাজেট বরাদ্দের নিশ্চয়তা দেবে, তাদের সঙ্গেই কৌশলগত সমঝোতা সম্ভব।
অন্যদিকে, হেদাশ-তা’আল বা জয়েন্ট লিস্ট তাদের আদর্শিক অবস্থানে অনড়। তারা কেবল বাজেটের বিনিময়ে সমর্থন দিতে রাজি নয়; তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়েস্ট ব্যাংকে দখলদারিত্ব বন্ধ করা, ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৃশ্যমান নীতি পরিবর্তন এবং আরব নাগরিকদের নাগরিক অধিকার পুরোপুরি পুনর্বহাল করা।
এই দুই কৌশলের দরকষাকষিতে এখন সরকার গঠনের পুরো গতিপথ আটকে রয়েছে। ইসরায়েলের বর্তমান ক্ষমতার নাটকে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিরোধী জোটের সঙ্গে সমঝোতা: গাদি আইজেনকোট বা জাইর লাপিদের বিরোধী জোট যদি অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে মনসুর আব্বাসের শর্ত মেনে নেয়, তবে আরব দলগুলোর পরোক্ষ সমর্থনে নেতানিয়াহু যুগকে পেছনে ফেলে নতুন এক জোট সরকার গঠিত হতে পারে।
নেতানিয়াহুর শেষ মুহূর্তের তাস: নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক চাতুর্য দিয়ে বিরোধী জোটের ভেতর ভাঙন ধরাতে পারেন অথবা কট্টরপন্থিদের বুঝিয়ে কোনো মধ্যবর্তী সমাধান বের করতে পারেন, যদিও বর্তমান বাস্তবতায় সেটি অত্যন্ত কঠিন।
পুনরায় নির্বাচন ও অচল অবস্থা: যদি কোনো দলই আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে না চায় বা তারা কোনো সমঝোতায় না আসে, তবে ইসরায়েল আবার আরেকটি আগাম নির্বাচনের দিকে ধাবিত হবে। যা দেশটিকে টানা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ফেলে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা বিদায় নিন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন ইসরায়েলি রাজনীতির দীর্ঘদিনের মেরূকরণকে ভেঙে দিয়েছে। যে আরব দলগুলোকে একসময় নিরাপত্তা ঝুঁকি বা শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, আজকের দিনে জেরুজালেমের ক্ষমতার চাবিকাঠি তাদের হাতেই। এটি কেবল নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে না, বরং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর আরব নাগরিকদের অবস্থান ও তাদের রাজনৈতিক প্রভাবকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে।