‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামের সামরিক অভিযানের আওতায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সোমবার রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৭৪৯টি আঘাত হেনেছে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী।
এসব আঘাতে নিহত হয়েছেন ২৩৯ জন হুথি কমান্ডার ও যোদ্ধা এবং ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোষ্ঠীটির ১১৭টি সামরিক যান ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজিদ আল নুজাইলি।
সোম-মঙ্গলবারের অভিযানে হুথি বাহিনীর কয়েকটি কমান্ড সেন্টার, দুর্গ, ফায়ারিং পজিশন, জমায়েতের স্থান এবং সরবরাহ রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে উল্লেখ করে এক্সবার্তায় কর্নেল নুজাইলি বলেন, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের মাঠ পর্যায়ের কমান্ড কার্যক্রমকে ব্যাহত করা, তাদের গোলাবর্ষণের স্থানগুলোকে অকার্যকর করা এবং সম্মুখসারির ইউনিটগুলোর কাছে যোদ্ধা ও রসদ পৌঁছানোকে বাধাগ্রস্ত করা।
যেসব উদ্দেশ্যে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল, সেসব সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন কর্নেল নুজাইলি। এক্সাবার্তায় তিনি আরও জানান, ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ তাইজে সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র ‘পপুলার রেজিস্ট্যান্স’ বাহিনী নিজেদের অর্জিত অবস্থানগুলোকে সুসংহত করছে এবং হুথিদের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
তাইজের পাশাপাশি আল-জওফ, মারিব ও আল-বায়দা প্রদেশসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টগুলোতেও সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, “সশস্ত্র বাহিনী তাদের সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে যাবে, তবে একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করবে।”
এদিকে, হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারী এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় দাবি করেছেন, সোম-মঙ্গলবারের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ১০১টি হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনি বাহিনী এবং এসব হামলায় রাজধানী সানা এবং বিভিন্ন প্রদেশের বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
তিনি জানান, রাজধানী ছাড়াও আল-জওফ, তাইজ, আমরান, হাজ্জাহ, সা’দা, আল-দালি, আল-মাহউইত ও লাহজ প্রদেশে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী হামলা করেছে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সারী বলেন, এসব হামলায় সৌদি আরবের খামিস মুশাইত ও তায়েফ বিমান ঘাঁটিতে মোতায়েন করা এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে এবং নাজরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
সোম-মঙ্গলবারের ২৪ ঘণ্টার অভিযানে রাজধানীসহ ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে নারী-শিশুসহ বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে বলেও দাবি করেছেন ইয়াহিয়া সারী, তবে হতাহতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা তিনি উল্লেখ করেননি।
হুথি মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩,৪৮০টিতে।
উভয় পক্ষের দেওয়া যুদ্ধক্ষেত্রের এসব দাবির সত্যতা অবশ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানা এবং উত্তর ইয়েমেনের বড় একটি অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে।
সর্বশেষ এই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা তাইজ, মারিব ও আল-জওফসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের অবস্থানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামে একটি অভিযান শুরু করেছে। সীমান্ত পেরিয়ে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথি সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে।
২০১৪ সালে হুথিরা সানা দখল করে নিলে ইয়েমেন সংঘাতের কবলে পড়ে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সেখানে হস্তক্ষেপ করে।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি করেছে।