রানওয়ে থেকে যাত্রী টার্মিনাল-আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে কক্সবাজারে। এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর অপেক্ষা। পরিকল্পিত রুটগুলো বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে বিস্তৃত রানওয়ে; এই রানওয়েকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল, প্রশস্ত অ্যাপ্রন আর বড় উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা-আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ কক্সবাজার বিমানবন্দরের। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী নভেম্বরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে পারে। এ উপলক্ষে পেনাং, কাঠমান্ডু ও কুনমিংসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুরুতেই মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এয়ার এশিয়া। পাশাপাশি নেপালের কাঠমান্ডু, চীনের কুনমিং ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগও চলছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘এয়ার এশিয়া কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে নিশ্চিত করেছে।’ প্রস্তাবিত এ ফ্লাইটের মাধ্যমে কক্সবাজারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
মন্ত্রী জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমানবন্দরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার থেকে নেপালের কাঠমান্ডু রুটেও সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। এর লক্ষ্য, চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকদের কক্সবাজারে আকৃষ্ট করা।
ঝিনুকের আদলে আধুনিক টার্মিনাল
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চালু করা হয়েছে ঝিনুকের আদলে নির্মিত নতুন যাত্রী টার্মিনাল। প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার, ১০টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও দুটি লাগেজ বেল্ট। পুরোপুরি চালু হলে টার্মিনালটির মাধ্যমে বছরে ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে।
সমুদ্রের ঢেউ ও শামুকের খোলসের আদলে নির্মিত টার্মিনালটি যাত্রীদেরও নজর কেড়েছে। আধুনিক অবকাঠামো ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে সন্তুষ্ট তাঁরা। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, শুধু দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নয়, কক্সবাজার থেকেই যেন সরাসরি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাতায়াত করা যায়।
কানাডাপ্রবাসী মেহেদী হাসান ইমন বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরটি খুবই সুন্দর ও আধুনিক হয়েছে। আমার কাছে এটি ঢাকার বিমানবন্দরের তুলনায় অনেক ভালো লেগেছে। বিমানবন্দরের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা দেখে বেশ ভালো লেগেছে। এখান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা গেলে সেটি খুবই ভালো হবে।’
মালয়েশিয়াপ্রবাসী রুবাইবা আহমেদের মতে, কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে প্রবাসীদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অনেক যাত্রীকে প্রথমে ঢাকায় এসে পরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কক্সবাজার যেতে হয়। এতে সময় ও ভোগান্তি বাড়ে।
রুবাইবা আহমেদ বলেন, ‘এখান থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে ঢাকায় যাত্রাবিরতি ও বিমান পরিবর্তনের ঝামেলা কমে যাবে।’
যাত্রী আমান উল্লাহও মনে করেন, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। তাঁর ভাষায়, ঢাকার তুলনায় কক্সবাজারে যানজট কম এবং বিমানবন্দরের আশপাশের পরিবেশও খোলামেলা। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এসব বিষয় যাত্রীদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
যাত্রী জসিম উদ্দিনের প্রত্যাশা, কক্সবাজার থেকে ভারত, নেপাল, চীনসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ভ্রমণ আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে বলে মনে করেন তিনি।
দেশের দীর্ঘতম ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে, নতুন অ্যাপ্রন
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে জমি পুনরুদ্ধার করে আগে ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। এতে বড় উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের নতুন অ্যাপ্রন। এতে একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের সুবিধা রয়েছে। সক্ষমতা যাচাইয়ের পর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার সনদও পেয়েছে বিমানবন্দরটি।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক মো. গোলাম মুর্তজা হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরটি প্রস্তুত রয়েছে। নতুন অ্যাপ্রন ব্যবস্থাপনার ফলে একই সময়ে ১০ থেকে ১২টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা সম্ভব হবে। এতে উড়োজাহাজ পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ২৭টি আগমন ও ২৭টি বহির্গমনসহ মোট ৫৪টি ফ্লাইট মুভমেন্ট পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি দুটি বোয়িং উড়োজাহাজও একই ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
নতুন টার্মিনাল ভবনটি আপাতত দেশীয় যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান বিমানবন্দরের পরিচালক।
তিনি বলেন, টার্মিনালে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টারের পাশাপাশি রয়েছে প্রশস্ত হোল্ডিং লাউঞ্জ। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৪৫০ জন যাত্রী বসতে পারবেন। লাউঞ্জ থেকে রানওয়ে ও উড়োজাহাজের ওঠানামার দৃশ্যও দেখা যাবে। নতুন অবকাঠামোর ফলে যাত্রীরা আগের তুলনায় আরও স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নত সেবা পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এয়ারলাইনস কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে শুধু বিমানবন্দর উন্নত করলেই হবে না। আবাসন, পর্যটনসেবা, যাতায়াতব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোতেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বেসরকারি এয়ারলাইনস নভোএয়ারের কক্সবাজার স্টেশনের ইনচার্জ সরওয়ার কাদের বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য রানওয়ে ও বিমানবন্দরের অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। দ্রুত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের কক্সবাজার স্টেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক মুসা আহমদ বলেন, নভেম্বরের দিকে কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে তাদের ঘোষণা আসতে পারে। এ বিষয়ে সম্ভাব্য রুট নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ চলছে।
মুসা আহমদ বলেন, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত রুট নির্বাচন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
তবে বিমানবন্দরের পাশাপাশি কক্সবাজারের পর্যটন খাতেও উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্নত আবাসন, বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের আগ্রহ বাড়বে।
রানওয়ে থেকে যাত্রী টার্মিনাল-আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে কক্সবাজারে। এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর অপেক্ষা। পরিকল্পিত রুটগুলো বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।